ব্যবসার কাজে পণ্য কিনতে যাচ্ছিলেন তাঁরা। গন্তব্য ছিল রাজশাহীর তাহেরপুর। সেখান থেকে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও ভুসামাল কিনে নিজ এলাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তাঁদের জীবনের শেষ যাত্রা। নাটোরের বড়াইগ্রামে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পাঁচ ব্যবসায়ী।
তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকার নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।
নিহত পাঁচ ব্যবসায়ী হলেন জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর মাদবর কান্দি এলাকার জহির উদ্দিন মাদবরের ছেলে জুয়েল মাদবর(৩৮), ডুবিসায়বর মোল্যা কান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে সালাল মোল্যা(৪০), ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার(২৮), কাজিরহাট এলাকার ভুসামাল ব্যবসায়ী সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে হলুদ ব্যবসায়ী শাহিন বেপারী(৩৭)। এছাড়াও গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ডুবিসায়বর বন্দর কাজীরহাট এলাকার বাসিন্দা আলমগীর মাদবর(৫৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত পাঁচজনই দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজিরহাটসহ আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করে আসছিলেন। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তাঁরা নাটোরে যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও ভুসামাল কিনে স্থানীয় বাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁদের মৃত্যু হয়।
নিহত জুয়েল মাদবর ভুসামাল ব্যবসার পাশাপাশি কাজিরহাটে রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকিরও ভুসামাল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শাহিন বেপারী হলুদ কেনাবেচা করতেন। অন্যদিকে সালাল মোল্যা ও সোহাগ শিকদার বিভিন্ন পণ্য কেনাবেচার ব্যবসা করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চালককে সতর্ক করেছিলেন যাত্রীরা
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী আলমগীর মাদবরের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবিরতির পর থেকেই বাসটির চলাচল অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। চালককে তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হওয়ায় যাত্রীরা তাঁকে সতর্ক করেন এবং গাড়ির গতি কমিয়ে ধীরে চালানোর অনুরোধ জানান। তবে তাঁদের অভিযোগ, চালক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে থাকেন।
একপর্যায়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে বাস ও ট্রাকের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও উদ্ধারকর্মীরা আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান।
বেঁচে যাওয়া যাত্রীর আলমগীর মাদবরের বর্ণনায় চালকের তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং যাত্রীদের সতর্কবার্তা উপেক্ষার বিষয়টি উঠে এলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। চালকের শারীরিক অবস্থা, গাড়ির গতি এবং সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
একসঙ্গে ব্যবসায়িক যাত্রা, ফিরলেন না সবাই
একই উপজেলার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী হওয়ায় নিহত পাঁচজনের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় ও সুসম্পর্ক ছিল। জীবিকার তাগিদে ব্যবসায়িক কাজে বেরিয়ে তাঁদের আর বাড়ি ফেরা হলো না। তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের পাশাপাশি শোকাহত হয়ে পড়েছেন সহকর্মী, বন্ধু ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
কাজিরহাটের ব্যবসায়ী দিদার সরদার বলেন, “ব্যবসার কারণে তাঁদের সবার সঙ্গেই আমার পরিচয় ছিল। তাঁদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল। তাঁদের এমন মৃত্যুর খবর খুবই কষ্টদায়ক।”
এ বিষয়ে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্ঘটনার বিষয়টি জেনেছি। তবে এখনো নাটোরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। মরদেহ জাজিরায় নিয়ে আসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
