নিজের শরীরের একটি অঙ্গ কেটে সন্তানের শরীরে বসিয়ে তাকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার মতো দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়। আর সেই বিরল আত্মত্যাগের গল্পই এবার সৃষ্টি হলো শরীয়তপুরের জাজিরা পৌরসভার উত্তর বাইকশা এলাকায়। বিশ্ব মা দিবসে নিজের ছেলে নাসিম জাহান আকাশের জীবন বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দান করেছেন মা নাসিমা সুলতানা।
মায়ের এই অসীম ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের ঘটনায় পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই বলছেন, “বিশ্ব মা দিবসে এর চেয়ে বড় ভালোবাসার উদাহরণ আর হতে পারে না।”
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় নয় মাস আগে হঠাৎ করেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন আকাশ। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তার দুটি কিডনিই প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। এরপর থেকেই শুরু হয় পরিবারের দুশ্চিন্তা, কান্না আর নির্ঘুম রাত। সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাসপাতাল, চিকিৎসক আর ডায়ালাইসিসের মধ্যেই কাটতে থাকে আকাশের জীবন।
ছেলেকে এভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখে ভেঙে পড়েন মা নাসিমা সুলতানা। তবে তিনি দমে যাননি। সন্তানের জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত নিজের একটি কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নাসিমা সুলতানা স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। একজন শিক্ষিকা হিসেবে যেমন তিনি শত শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক, তেমনি একজন মা হিসেবে দেখালেন আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ উদাহরণ।
রোববার (১০ মে) বিশ্ব মা দিবসেই ঢাকায় আকাশের কিডনি প্রতিস্থাপন অপারেশন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। অপারেশনটি পরিচালনা করছেন দেশের খ্যাতিমান কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ও ইউরোলজিস্ট ডা. মো. কামরুল ইসলাম। তিনি ঢাকার সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মানবিক চিকিৎসাসেবা ও স্বল্প খরচে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি দেশজুড়ে পরিচিত।
আকাশের বড় বোন বৃষ্টি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাইকে বাঁচানোর জন্য মা নিজের শরীরের একটি অংশ দিয়ে দিচ্ছেন। পৃথিবীতে মায়ের মতো কেউ হতে পারে না। মা দিবসে এটাই আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ঘটনা। সবাই আমার মা ও ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, “একজন মা নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে সন্তানের জন্য কিডনি দিচ্ছেন—এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। ঘটনা শুনে আমাদের চোখে পানি চলে এসেছে।”
জাজিরা উপজেলার শিক্ষক সমাজের সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “নাসিমা ম্যাডাম সবসময়ই একজন মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আজ তিনি যেটা করলেন, সেটা একজন মায়ের ভালোবাসার সর্বোচ্চ উদাহরণ হয়ে থাকবে।”
স্থানীয় সমাজকর্মী জামাল মাদবর বলেন, “মা দিবসে অনেকেই আবেগঘন পোস্ট দেন। কিন্তু একজন মা নিজের সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের অঙ্গ দান করছেন—এটাই প্রকৃত মা দিবসের অর্থ বুঝিয়ে দেয়।”
এদিকে উত্তর বাইকশা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আকাশের সুস্থতা কামনায় স্থানীয়রা দোয়া ও প্রার্থনা করছেন। কেউ হাসপাতালে খোঁজ নিচ্ছেন, আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা-ছেলের জন্য দোয়া চেয়ে পোস্ট করছেন।
সমাজ সচেতন’রা বলছেন, পৃথিবীর সব সম্পর্কের মধ্যে মায়ের সম্পর্কই সবচেয়ে নিঃস্বার্থ। একজন মা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে পারেন। শরীয়তপুরের এই ঘটনা যেন সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এলো।
বিশ্ব মা দিবসে এই মায়ের আত্মত্যাগের গল্প শুধু শরীয়তপুর নয়, পুরো দেশের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। কারণ, পৃথিবীর সব ভাষা ও অনুভূতির ওপরে ‘মা’ শব্দটিই সবচেয়ে শক্তিশালী।
