শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার(৫ আগস্ট) সকালে জাজিরা প্রান্তের মাঝিরঘাট আলম খারকান্দি এলাকায় অন্তত ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনে ঐ এলাকার একটি দ্বিতল মসজিদ, দুটি দোকান, সাতটি বসতবাড়িসহ মাঝিরঘাট-পালের চর সড়কের ৫০০ মিটার নদীতে বিলীন হয়েছে।
এ নিয়ে ৭ দফায় বাঁধের ৮০০ মিটারসহ অন্তত এক কিলোমিটার এলাকা পদ্মায় বিলীন হয়েছে। গত দুই মাসে বাঁধের পাশে থাকা প্রায় ৪০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ৬০টি বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা বাড়ায় পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা রক্ষা বাঁধের পাশের তিনটি গ্রামের অন্তত ৮০০ পরিবার ও মঙ্গল মাঝি-সাত্তার মাদবর ঘাট ও বাজারের ২৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে রয়েছে।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড(পাউবো) ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরে পদ্মা নদীর অংশ জাজিরার নাওডোবা এলাকা থেকে শুরু হয়েছে। নাওডোবার ওপর দিয়েই পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর জাজিরা প্রান্তে পদ্মা নদীর ৫০০ মিটারের মধ্যে সার্ভিস এরিয়া ২, সেনানিবাস, পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণে ২০১২ সালে জমি অধিগ্রহণের সময় থেকে নাওডোবা এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। পদ্মা সেতুর প্রকল্প এলাকা নদীভাঙন থেকে রক্ষা করতে সেতু থেকে ভাটির(পূর্ব)দিকে দুই কিলোমিটার এলাকায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মানদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। ওই বাঁধের পাশে(দক্ষিণে) আলম খাঁর কান্দি, অছিম উদ্দিন মাদবর কান্দি, উকিল উদ্দিন মুন্সি কান্দি ও মঙ্গল মাঝি-সাত্তার মাদবর ঘাট ও বাজার অবস্থিত।
পাউবো’র তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে জাজিরার পূর্বনাওডোবা জিরোপয়েন্ট এলাকায় বাঁধে প্রথম ভাঙন দেখা দেয়। এরপর এ বছরের ৭ জুন ১০০ মিটার, ৭ জুলাই ২০০ মিটার, ৯ জুলাই ১০০ মিটার, ২৩ জুলাই ১০০ মিটার বাঁধের অংশ, ৩১ জুলাই ১১০ মিটার এবং ৫ আগস্ট আরও ২০০ মিটার এলাকা ভেঙে পদ্মায় বিলীন হয়েছে। ভাঙন রোধে অস্থায়ীভাবে ৫০০ মিটার এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৩ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙন থামানো যাচ্ছে না।
গত মঙ্গলবার সকালে বাঁধের পাশে থাকা আলম খার কান্দি গ্রামের দুইতলা একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই সময় ভাঙনে মসজিদের পাশে থাকা ৭টি বসতবাড়ি ও দুটি দোকান নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা রক্ষা বাঁধের পাশ দিয়ে ছিল মাঝিরঘাট-পালের চর সড়ক। ওই সড়কের ৫০০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। খবর পেয়ে বালুভর্তি জিওব্যগ ও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পাউবোর কর্মীরা।
আলম খার কান্দি এলাকায় একটি মুদি দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন হারুন খান(৬৫)। মঙ্গলবার সকালের ভাঙনে তার দোকানটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। হারুন খান বলেন, ‘সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন ছিল আমার ওই দোকানটি। সেটি নদীতে চলে গেলো। সাথে বসতবাড়ির দুটি ঘরও চলে গেছে। বাড়ির অন্য দুটি ঘর সরিয়ে নিয়েছি। এখন কোথায় আশ্রয় নেবো জানিনা।’
আলম খার কান্দি এলাকার বাসিন্দা হনুফা বেগম(৭০) দিমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এপর্যন্ত ৮ বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালের ভাঙনে মসজিদের পাশে থাকা তার বসতবাড়িটি বিলীন হয়ে যায়। হনুফা বেগম বলেন, ‘‘আমাগো আর কোন অবস্থা নাই। এই পর্যন্ত আটবার নদীতে সব নিয়া গেছে। অহন এই বাড়িডাও নিয়া গেলো। কই যামু কি করমু জানিনা।’’
মঙ্গলবার দুপুরে জাজিরার পূর্বনাওডোবা আলম খার কান্দি এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, থেমে থেমে নদীভাঙন অব্যহত রয়েছে। নদীর তীরের মাটি ভেঙে বিলীন হচ্ছে। একারনে আশপাশের মানুষ আতঙ্কে নিজেদের বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন। ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর কর্মীরা নদীতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছেন। বসতবাড়িগুলোতে থাকা বিভিন্ন ধরনের গাছপালা কেটে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
পাউবোর শরীয়তপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী তারেক হাসান বলেন, ‘‘নদীতে পানি ও স্রোত এখন অনেক বেশি হওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় ভাঙন হচ্ছে। আমরা নিয়মিত জিও ব্যাগ ফেলে প্রাথমিকভাবে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি খুব শিঘ্রই প্রস্তাবটি অনুমোদন হবে।’’
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, ‘‘নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। তাদের খাদ্য ও অর্থসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যাদের কোনো থাকার জায়গা নেই, তাঁদের সরকারের খাসজমিতে পুনর্বাসনের জন্য ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’’
