শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে পরিবেশ আইন অমান্য করে রাতের আঁধারে কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে সরবরাহ করা হচ্ছে ইটভাটায়। এতে যেমন কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকেই পরদিন সকাল পর্যন্ত চলাচল করে মাটিভর্তি শতাধিক ড্রাম ট্রাক। মাটিবাহী ট্রাকের প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ সড়কগুলোতেও। গ্রামীণ সড়কে মাটি বোঝাই মাহিন্দ্র চলাচলের কারণে প্রায় দশ কিলোমিটার পাকা সড়কে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছে ওই পথে যাতায়াতকারী যানবাহন ও পথচারীরা। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে।
মাটি ব্যবসায়ীদের লুট থেকে বাদ যাচ্ছে না খাসজমি, খাল ও নদ-নদীর তীর। এসব মাটি বিক্রি হচ্ছে ইটভাটা সহ বিভিন্ন জলাশয় ভরাটের কাজে । গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়ায় এরই মধ্যে ওই এলাকার শতাধিক একর কৃষিজমি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। জমিগুলো বোরো ধান আর শর্ষে চাষ করা হতো। গভীর গর্ত করে মাটি কাটায় ওই সব জমিতে দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন।
মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের।
সোমবার(১৫ ডিসেম্বর) রাতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের মেহেরচান সরকার কান্দি ও ডিএমখালি ইউনিয়নের চর হোগলা এলাকায় কৃষি জমির মাটি কেটে নেওয়ায় ইতিমধ্যেই ফসল উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। মাসের পর মাস রাতের আঁধারে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ভূমিদস্যু ও মাটি ব্যবসায়ীরা। ভারী ট্রাক দিয়ে মাটি বহন করার ফলে গ্রামের এলজিইডির কার্পেটিং সড়ক বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে দেবে গেছে। এসব জমিতে প্রতি বছর ধান, সরিষা ও সবজির আবাদ করেন কৃষকরা। ভেকু মেশিন দিয়ে ডাম্প ট্রাক ভর্তি করে এসব মাটি ইটভাটায় নিচ্ছেন। এতে জমির উর্বরতা শক্তি কমতে শুরু করছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত চলাচল করে মাটিভর্তি শতাধিক ট্রাক। মাটিবাহী ট্রাকের প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ সড়কগুলোতেও। গ্রামীণ সড়কে মাটি বোঝাই মাহিন্দ্র চলাচলের কারণে প্রায় দশ কিলোমিটার পাকা সড়কে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়ছে এপথে যাতায়াতকারী যানবাহন ও পথচারীরা। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে। চক্রটি প্রভাবশালী হওয়ায় প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেন না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন বলেও জানান ভুক্তভোগী কৃষকরা।
সরকার কান্দি এলাকার বাসিন্দারা রহিম মিয়া। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে ৪০ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে সেখানে ধান, গম, সরিষা ও সবজির আবাদ করছেন তিনি। ফসল বিক্রির টাকায় ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার পাশাপাশি পিতামাতার খরচ সবকিছুই এই জমির ফসল বিক্রির আয় থেকে। তার পাশের জমির মাটি বিক্রি হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। ড্রাম ট্রাক গুলো তার জমির উপর দিয়ে যাতায়াত করার কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। সোমবার রাতে ফসল দেখতে এসেছেন রহিম মিয়া। এসময় সাংবাদিক দেখে এগিয়ে এসে তিনি বলেন, প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে রাতের আঁধারে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ভূমিদস্যুরা। গভীর রাতে আমার জমির উপর দিয়ে বড় বড় ড্রাম ট্রাক যাতায়াতের কারণে আমার ক্ষেতের ৩০ ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিবাদ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। আরও নানারকম হুমকি-ধামকির সম্মুখীন হতে হয়।
চর হোগলা গ্রামের বাসিন্দা সোহেল মাদবর। সোমবার রাতে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, রাতভর মাটি কাটার ফলে সৃষ্ট ধুলাবালিতে রসুন, পেঁয়াজ, মসুরসহ নানা ফসল নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া মাটি বহনের জন্য ভারী ট্রলি ও ট্রাক চলাচলের কারণে এলাকার কাঁচা-পাকা সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা চলে কৃষি কাজ করে। প্রতিটি জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল হয়। এই ফসল বিক্রি করে সংসারের সব কাজ করে থাকি। এসব নিয়ে প্রতিবাদ করলে ভয়-ভীতি দেখায়। নিজ থেকে মাটি না দিতে চাইলেও জোর করে মাটি নিয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তা করে নেবেন বলেও হুমকি দেন।
স্থানীয় কৃষিবিদ এস.এম রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষিজমির উপরি ভাগের মাটি কেটে ফেলায় এর উর্বরতা হারিয়ে যাচ্ছে। জমির উপরিভাগের চার থেকে ছয় ইঞ্চি (টপ সয়েল) গভীরের মাটিতেই মূল পুষ্টিগুণ থাকে। মূলত মাটির এই স্তরে ফসল উৎপাদিত হয়। মাটির এই স্তর কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরশক্তি নষ্ট হয়। এ জন্য অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। তা ছাড়া কৃষিজমির ওপরের এ টপ সয়েল হারিয়ে ফেললে তা স্বাভাবিক হতে প্রায় ১০-১২ বছর লাগে। যেভাবে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে ওই এলাকার কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্রশাসনের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।”
মাটি বিক্রি সঙ্গে জড়িত কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় নি। তবে কথা হয় এক্সকেভেটর(ভেকু) চালক মো. রাকিব হাসানের সাথে। তিনি বলেন, তোফাজ্জল সরকারের নির্দেশে আমি এখানে এসেছি। আমি পাঁচদিন ধরে কাজ করি। ওইদিন একজন কৃষিক এসে বাঁধা দিয়েছিলো পরে তাকে কিভাবে ম্যনেজ করছে আমি জানি না। কিছু ফসল তো নষ্ট হবেই কারণ গাড়ীগুলো যেতে অনেক জায়গা প্রয়োজন। আমি কাজ করি টাকা পাই এর বেশি কিছুই জানি না। পরশুদিন সখিপুর থানা থেকে পুলিশ এসেছিলো তারা মালিকের সাথে দেখা করে চলে গেছে। প্রশাসনকে জানান ছাড়া কাজ করা সম্ভব নয় আপনি নিউজ করে কি করবেন?।
এ বিষয়ে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোঃ নাজিম উদ্দীন বলেন, মাটি ও বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ-প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যেসব জায়গায় ফসলি জমির মাটি কেটে পাচার হচ্ছে সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে তা বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনার পরও রাতে অবৈধভাবে ট্রাক্টর-ট্রলি দিয়ে মাটি বহন করায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। সেইসঙ্গে নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। যারা এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
