শরীয়তপুরের ডামুড্যার ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে(৫০) শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে মামলাটি করেছেন খোকন চন্দ্রের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস। ওই মামলায় তিন ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন সোহাগ খান(২৭), রাব্বি মোল্লা(২১) ও পলাশ সরদার(২৫)। তারা তিনজনেই ডামুড্যার কণেশ্বর এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
আহত খোকনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে তার শরীরে অস্ত্রপচারের পর তাকে জরুরী বিভাগের পাশে পর্যবেক্ষন কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডামুড্যার কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এরপর সন্ত্রাসীরা তার গায়ে পেট্টোল জাতীয় দ্রব্য দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে রাতে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। খোকন চন্দ্র উপজেলার কেহরভাঙা বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ী ও মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশের ব্যবসায়ী। খোকন চন্দ্র দাসের ওপর এমন হামলা মানতে পারছেন না এলাকার মানুষ ও আত্মীয় স্বজনরা।
ডামুড্যা থানা ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, ডামুড্যার কনেশ্বর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তিলই গ্রামের বাসিন্দা পরেশ চন্দ্রের ছেলে খোকন চন্দ্র দাস। তিনি ২০ বছর ধরে কেহরভাঙ্গা বাজারের ঔষধ ও মোবাইল ব্যাংকিং এর ব্যবসা করেন। ওই ব্যবসার ফাকে তিনি পল্লী চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন।
প্রতিদিন রাতে ব্যবসার কাজ শেষ করে বাজার থেকে তিলই গ্রামের বাড়িতে ফেরেন। বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে দোকানের সারা দিনের বিক্রির ৬ লাখ টাকা নিয়ে একটি সিএনজি চালিত অটো রিক্সায় করে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডামুড্যা-শরীয়তপুর সড়কের তিলই বাসষ্টান্ডের কাছে নামেন। এরপর তিনি ইটের রাস্তা ধরে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। কিছু দুর যাওয়ার পর তিনজন সন্ত্রাসী তার গতিরোধ করে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের ৪টি স্থানে আঘাত করেন। এরপর তারা খোকন চন্দ্রর শরীরে পেট্টোল জাতীয় দ্রব্য দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য খোকন সড়কের পাশে একটি পুকুরের মধ্যে ঝাঁপ দেন। আশপাশের লোকজন তার চিৎকার চেঁচামেচিতে ছুটে আসলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে রাত দশটার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে জরুরী বিভাগে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তার শরীরের ক্ষত ও পুরে যাওয়া স্থান গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই ঢাকায় পাঠানো হয়।
বুধবার গভির রাতে খোকন চন্দ্রকে তার স্বজনেরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তার শরীরের ক্ষতস্থানে অস্ত্রপচার করা হয়।
আহত খোকন হামলায় অংশ নেয়া দুই জনের নাম বলেছেন। তারা হলেন কনেশ্বর এলাকার বাবুল খানের ছেলে সোহাগ খান(২৭) ও সামসুদ্দিন মোল্যার ছেলে রাব্বি মোল্যা(২১)। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ওই ঘটনায় অংশ নেয়া আরেকজনের নাম জানতে পারেন। ওই ব্যক্তি স্থানীয় শহীদ সরদারের ছেলে পলাশ সরদার(২৫)।
ওই ঘটনার পর কেহরভাঙা বাজারের ব্যবসায়ী ও তিলই গ্রামের মানুষ বিক্ষুব্দ হয়ে ওঠেন। তারা অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে আটক করে শাস্তি দেয়ার দাবী জানান। তখন পুলিশ ওই দুইজনের বাড়িতে অভিযান চালায়। তাদের না পেয়ে তাদের বাবাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে থানায় একটি মামলা করা হয়। আহত খোকন দাসের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলায় ওই তিন তরুণকে আসামি করা হয়েছে। এরপর রাতে পুলিশ সোহাগ ও রাব্বির বাবাকে থানা থেকে ছেড়ে দিয়েছেন।
খোকন চন্দ্রের প্রতিবেশি ও আত্মীয় নিখিল দাস বলেন, খোকন আমার বয়সে ছোট হলেও কর্মের কারনে তাকে আমরা সম্মান করি। তার ওপর এমন হামলা আমরা মানতে পারছি না। ঘটনার পর থেকে ভয়ে আমরাও বাড়ির বাহিরে যাচ্ছি না। এ ঘটনায় এলাকায় সকলের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বুধবার রাতে খোকনকে নিয়ে ঢাকায় যান তার বাবা পরেশ চন্দ্র দাস, স্ত্রী সীমা দাস ও স্কুল পড়ুয়া ছেলে শান্ত দাস। তারা খোকনের পাশে বসে কান্না করছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খোকনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে নেয়া হয়।
বৃহস্পতিবার রাতে থানায় মামলা করার জন্য ঢাকা থেকে ডামুড্যায় আসেন খোকনের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগের পাশে পর্যবেক্ষন কক্ষে ছেলেকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। চিকিৎসক বার্ন ইউনিটে নেয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা তাকে সেখানে নিতে পারছিলাম না। সেখানে ছিট পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে এক নেতার সহযোগিতায় গভীর রাতে তাকে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে নেয়া হয়।
সন্ত্রাসীরা তার কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়ার পর হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে আহত করার পরে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় সে প্রাণে বেঁচে গেছে। জানিনা কত দিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। এ ঘটনায় আমি থানায় মামলা করেছি। আমরা চাই পুলিশ দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনুক।
ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মোহাম্মদ রবিউল হক বলেন, ‘কেহরভাঙ্গা বাজারের ব্যবসায়ীর উপরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এজাহারে নাম থাকা তিন আসামীকে গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। তাদের সন্ধান জানার জন্য তাদের দুই জনের বাবাকে থানায় আনা হয়েছিল। মামলা দায়ের করার পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’
