শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নে সরকারি সহায়তার চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে এলাকায় তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সুবিধাভোগী ১০৫০ জেলেদের মাঝে ৮০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খান জেলেদের চাল বিতরণ করেছেন ৭০-৭২ কেজি করে।
গত ৩ মার্চ চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। প্রাথমিক ভাবে চাল বিতরণে অনিয়মের সত্যতাও পায় উপজেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যেই গঠন হয়েছে তদন্ত কমিটিও। এরই মধ্যে অভিযোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে শুক্রবার বিকেলে তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন অভিযুক্ত চেয়ারম্যান সেকান্দার খান ও তার লোকজন।
সরেজমিনে গিয়ে, উপজেলা প্রশাসন ও উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে পদ্মা ও মেঘনা নদীর অভয়াশ্রমে মাছ ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের পাঁচটি অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে ১০৫০ জন জেলেকে ৮০ কেজি করে চাল দেয় সরকার। মা ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা প্রকৃত মৎসজীবী জেলেদের জীবন যাত্রা নির্বাহের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সরকার মৎস অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতি বছর ভিজিএফ চাল বিতরণ করে থাকে। এতে কার্ড ধারী মৎসজীবী জেলেরা প্রত্যেকে ৮০ কেজি চাল পেয়ে থাকেন। কিন্তু দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খান প্রত্যেক জেলেকে ৮ থেকে ১০ কেজি চাল কম দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে চাল বিতরণ করার কথা থাকলেও ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেদরগঞ্জ উপজেলার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান সরকার উপস্থিত হওয়ার আগেই সকাল ৭ টা থেকে এ চাল বিতরণ শুরু করেন সেকান্দার খান ও তার লোকজন। চাল মেপে দেওয়ার কথা থাকলেও তা না দিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মতো চাল বিতরণ করছেন চেয়ারম্যান। চাল বিতরণে অনিয়মের খবর পেয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে দেখতে পায় প্রত্যেক জেলেকে চাল কম দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) হাফিজুল হককে জানানো হলে তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি) কে.এম রাফসান রাব্বি ও সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল ইমরানকে ঘটনাস্থলে পাঠান। তারা এসে চাল বিতরণে অনিয়মের সত্যতা পান। এরপর তারা দাঁড়িয়ে থেকে বাকি থাকা জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ করেন। ট্যাগ অফিসার উপস্থিত হওয়ার আগে চাল বিতরণ, ওজনে কম দেওয়াসহ অনিয়মের বিষয়ে সহকারী কমিশনার ভূমি প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খানকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। ওইদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে শুরু হয় সমালোচনা।
এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান সেকান্দার খান তড়িঘড়ি করে শুক্রবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে সামাজিকভাবে হেয় করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি বলেন কাউকে, কাউকে তিনি ৮২ কেজি করে চাল দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি দাবি করেন গোডাউন থেকে ৫ কেজি করে চাল কম দেওয়া হয়েছে। তবে খাদ্যগুদাম কতৃপক্ষ জানিয়েছেন গোডাউন থেকে চাল কম দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্রাকে চাল লোড করার পরে এধরণের অভিযোগের দায় খাদ্যগুদামের নয়।
দক্ষিণ তারাবুনিয়ার এলাকার জেলে সোহেল মিয়া বলেন, আমাদের চাল পাওয়ার কথা ৮০ কেজি আমি পেয়েছি ৭২ কেজি। এটা কি অনিয়ম নয়। দেখলাম চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলন করেছে সেখানে কোনো জেলে বক্তব্য দেয় নি। তিনি অন্য কাউকে এনে জেলে বানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আমি মনে করি চাল কম দেওয়ার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।
একই এলাকার রফিক বলেন, “এটা জেলেদের অধিকার নিয়ে খেলা। সরকারি সহায়তার চাল নিয়ে অনিয়ম হলে কঠোর তদন্ত হওয়া দরকার। নিজ চোখে ওইদিন দেখেছি চাল কি ভাবে কম দিয়েছেন চেয়ারম্যান ও তার লোকজন। ওইদিন সাংবাদিকদের সত্যি কথা যাঁরা বলেছেন তাদের বাড়ীতে গিয়ে চেয়ারম্যানের লোকজন হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। বলে কার্ড বাতিল করে দিবে এবং ইউএনও স্যারের ভয় দেখিয়েছে। শুক্রবার দেখলাম পরিষদে নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে এটা আশ্চর্যজনক। তিনি বললো কাউকে না কি ৮২ কেজি চালও দিয়েছে। আমার প্রশ্ন জেলে পাবে ৮০ কেজি তাকে ৮২ কেজি দিলে বাকি দুই কেজি কোথায় পেলো?। এতেই বুঝা যায় কি পরিমাণ অনিয়ম হয়েছে এই চাল বিতরণে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, প্রাথমিকভাবে জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছি। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
