শরীয়তপুরের জাজিরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহতের পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর অন্তত দুই দফায় প্রতিপক্ষের অর্ধশত বাড়িঘরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। লুট করে নেওয়া হয়েছে গবাদিপশু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাও। এমনকি কয়েকটি পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবিরও অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযোগ পেলে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস পুলিশের।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল শিকদার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তমিজ খাঁর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছে। সেই সূত্র ধরে সোমবার সন্ধ্যায় দুই পক্ষের সমর্থকদের সংঘর্ষে বিস্ফোরিত হয় অন্তত শতাধিক ককটেল।
বিস্ফোরণে একজনের হাতের কবজি উড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আহত হন কমপক্ষে ১০ জন। আর ঘটনাস্থলেই ককটেল বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান ৭০ বছর বয়সী মান্নান সরদার।
মান্নান সরদারের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছেলে দিদার সরদার বাদী হয়ে বুধবার জাজিরা থানায় ৮৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করে। পুলিশ ওই মামলার এজাহারভুক্তসহ ৮ আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। কিন্তু মামলা হওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বুধবার(১২ আগস্ট) দিনগত রাতে রেজাউল শিকদারের নেতৃত্বে প্রতিপক্ষ ফারুক চৌকিদার, ইউনূস আলী চৌকিদার, ইদ্রিস চৌকিদার, লিটন চৌকিদার, মনরজান বিবি, আজাহার চৌকিদার, ওয়াসিম চৌকিদার, উকিল চৌকিদার, জসিম চৌকিদার, বাচ্চু চৌকিদার, শাহজাহান চৌকিদার, রাজ্জাক মাদবর, নূরুল আমিন মাদবর, মোশাররফ চৌকিদারসহ অর্ধশত বাড়িতে হামলা ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠে।
ভাঙচুর করা হয় ঘরের দরজা-জানালা, আসবাবপত্র এমনকি ফুটো করে দেয়া হয় ভবনের ছাদও।
বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তৈরি করা হয় আতঙ্ক। এরপর চলে লুটপাট। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাড়িঘর থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গরু-বাছুর, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা। কোনো কোনো পরিবারের কাছে আবার দাবি করা হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা করে চাঁদা।
চর গজনাইপুর এলাকার মালেশিয়া প্রবাসী উকিল চৌকিদার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মালেশিয়ায় অবস্থান করছেন। এদিকে বোমা বিস্ফোরণে মারা যাওয়ার পর তার বাড়িতেও চালানো হয়েছে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট। তার স্ত্রী রুবিনা আক্তারের দাবী প্রতিপক্ষের প্রধান রেজাউল শিকদার তাদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবী করেন। চাঁদা না দেয়ায় তার বসতবাড়িতে এই লুটপাট চালানো হয়।
আরেক ভুক্তভোগী সুমি বেগম অভিযোগ করে বলেন, সেদিন মারামারি হয়েছে চরধুপুর এলাকায়। আমার স্বামী প্রবাসে, তিনি তো মারামারি অংশ নেয়নি। রেজাউল শিকদার এসে ঘর প্রতি ৫ লাখ করে চাঁদা দাবি করেছে। আমরা সেই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গতকাল রাতে আমাদের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে লুটপাট করা হয়।
জসিম চৌকিদারের স্ত্রী শিমুলি বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামী লাউখোলা বাজারে ব্যবসা করে। সে মারামারিতে না যাওয়ার পরও তাকে আসামী করা হয়েছে। গতকাল রেজাউল শিকদারের নেতৃত্বে আমাদের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে দুইটা গরু, স্বর্ণালঙ্কার টাকা পয়সা সব কিছু লুটপাট করে নিয়েছে। তারা ভয়ভীতি দেখাতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। আমরা কোনমতে জীবন নিয়ে চরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি।
বোমা বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যুর ঘটনার পর প্রতিশোধের আগুনে রেহাই পায়নি অনেক নিরপরাধ মানুষের বসতবাড়িও। অভিযোগ, সংঘর্ষে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে তাদের ঘরবাড়িতে। ভুক্তভোগীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুমি আক্তার নামের এক গৃহবধূ বলেন, আমার স্বামী প্রবাসে থাকেন। আমরা মারামারির ব্যাপারে কিছুই জানিনা। এরপরেও আমার ঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। ঘরের সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। আমরা যে ঘরে থাকবো, কিছু রান্না করে খাবো সেই অবস্থায় নেই। আমরা চাই ঘটনার তদন্ত করে যারা সেদিন মারামারিতে ছিলো তাদের বিচার হোক, আমাদের বাড়িঘরে যারা হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে তাদেরও বিচার চাই এবং ক্ষতিপূরণ চাই।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ইমরান আল নাজির বলেন, একজন মানুষ মারা গেলো, সেখানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এদিকে মারা যাওয়া পক্ষের লোকজন প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা লুটপাট ভাঙচুর চালালো এটাও আরেকটি অপরাধ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যারা মামলা বানিজ্য লুটপাট করে তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
তবে লুটপাটের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে রেজাউল শিকদার বলেন, আমার জানামতে এমন কিছুই হয়নি। তারা নিজেদের মালামাল নিজেরা সরিয়ে এখন আমাদের উপর দায় চাপাচ্ছে।
এদিকে হত্যা মামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আর লুটপাট প্রতিহত করতেও তৎপর রয়েছে তারা। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এবিষয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মিরাজ বলেন, নিহতের ঘটনায় নিহতের ছেলে বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এই ঘটনায় আট জনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি এ অঞ্চলের একটি কালচার ঘটনা ঘটার পরে প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা ভাঙচুর করা। আমরা তা প্রতিহত করা চেষ্টা করছি। গতকাল রাতে বোমা বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।
